হাদীসের পরিচয় ও মর্যাদা

0
1360
হাদিসের পরিচয় ও মর্যাদা

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ধর্ম। মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলাম দিক নির্দেশনামূলক বিশাল দায়িত্ব পালন করে আসছে। আর কুরআনুল কারীম মানবজীবনে নিয়ম-নীতির মূলগ্রন্থ।
যা আল্লাহ তা’আলা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য অবতীর্ণ করেছেন। এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দায়িত্ব তিনি নবী করীম সাল্লাাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাঁধে অর্পণ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন-
وأنزلنا إليك الذكر لتبين للناس ما نزل إليهم-
অর্থাৎ আমি তোমার প্রতি কুরআন অবর্তীণ করেছি মানুষকে সুষ্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি অবর্তীণ করা হয়েছিলো।
(সূরা নাহলঃ আ-৪৪)
আর এই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দায়িত্ব তিনি নিজের মনমতো করেননি; বরং এটাও ওহীর ওপর ভিত্তি করে হতো, আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
وما ينطق عن الهوي-
অর্থাৎ তিনি মনগড়া কথা বলেন না, এটাতো ওহীই- যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়। (সূরা নাজমঃ আ-৩)
সুতরাং কেমন যেনো হাদীসে নববীর ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার ওহী। এটা ইসলামী শরীয়তের বুনিয়াদ সমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদ।

এটা শরীয়তের ইমারতের একটি মজবুত খুঁটি। এছাড়া ইসলামের নিয়ম-নীতি ও শরীয়তের হুকুম-আহকামের বর্ণনার ক্ষেত্রে হাদীসের অবস্থান দ্বিতীয়। কিন্তু যেহেতু এটা এমন এক গভীর সমুদ্র- যার কিনারা পাওয়া দুষ্কর, তাই এটা এমন এক বিশাল ভান্ডার- যা সহজে না আয়ত্ব করা যায়, না হিফাযত করা যায় আর না উত্তম-অনুত্তম নির্ণয় করা যায়।
অপরদিকে সুখ্যাতি অন্বেষণকারী কিছু লোক, আকীদার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িমূলক আচরণকারী এবং রাজা বাদশাহদের কিছু চাটুকার নিজের উদ্দেশ্য অর্জন ও স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের লক্ষ্যে মনমতো বানোয়াট হাদীস বর্ণনা করে হাদীসে নববীর মতো মূল্যবান ভান্ডারে এগুলো মিলিয়ে ফেলে সব এলোমেলো করে দেয়।
এই কারণেই উম্মতের আলিমগণ নবী করীম সাল্লাাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী, কার‌্যাবলী এবং যেসব কাজকে তিনি সমর্থন করেছেন, সেগুলো তাঁরই প্রিয় সাহাবায়ে কেরামগণের মাধ্যমে শব্দে শব্দে অবিকল আমাদের পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন।

তাঁরা এই হাদীস শাস্ত্রকে সর্বপ্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি, শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা এবং প্রমাণিত-অপ্রামণিত হওয়ার বিষয়টি জানার জন্য হাদীস সমূহের সহীহ রুচি-মিযাজকে সামনে রেখে বিভিন্ন মূলনীতি গঠন করতঃ এর ওপর কিছু শর্ত আরোপ করেছেন, যার দ্বারা হাদীসের অবস্থান মর্যাদা আহকাম বর্ণনা করার ক্ষেত্রে তার ওপর আমল করার যোগ্য হওয়ার বিষয়টি পরখ করা যায়।
যে হাদীস প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে যত উ”” স্তরের পর্যায়ে উপনীত হয়, উক্ত হাদীসটি আমলের ক্ষেত্রে ঠিক সে পরিমাণই গ্রহণযোগ্য হবে। যেহেতু নবী করীম সাল্লাাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো হাদীস প্রামাণিত হওয়া বা না হওয়া জানার মাধ্যম হচ্ছে উক্ত হাদীসের বর্ণনাসূত্রের (ইসনাদ) সনদ।
তাই যে হাদীসের বর্ণনাকারীগণ যে পরিমাণ গ্রহণযোগ্যতার শিখরে উন্নীত হবেন, উক্ত হাদীসটি প্রমাণিত হওয়ার ক্ষেত্রে সেরকম উচ্চস্তরে উত্তীর্ণ হবে।

এছাড়া উক্ত হাদীস মর্যাদা ও শুদ্ধতার ক্ষেত্রেও ওই পরিমাণ যোগ্যতা অর্জন করবে। যে হাদীসের মধ্যে এই বিষয়গুলো তুলনামূলক কম পাওয়া যাবে, ওই হাদীস সে পরিমাণ কম স্তরের পর্যায়ে পরিগণিত হবে।
মোটকথা মুহাদ্দিসগণ হাদীস সমূহের রুচি-মিযাজকে সামনে রেখে হাদীস প্রমাণিত হওয়ার শর্ত সমূহ গঠন করেছেন। এই হিসেবে হাদীস সমূহ বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে। যথা- সহীহ, হাসান ও যয়ীফ।

হাদীস কাকে বলে?
আভিধানিক অর্থঃ
হাদীস শব্দের আভিধানিক অর্থ কথা। এ প্রসঙ্গে ইমাম জাওহারি রহ. (মৃত্যু- ৩৯৮ হি.) বলেন-
الحديث- الخبر يأتي علي القليل والكثير-
হাদীসের অর্থ কথা; চাই তা কম হোক বা অধিক। (আস-সিহাহ-২২৯)
পারিভাষিক অর্থঃ
হাদীস ও সুন্নাহর আলিমগণ হাদীসের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিভিন্ন বাক্য ব্যবহার করেছেন। তবে এসব বাক্যের শব্দগত পার্থক্য দেখা দিলেও মূল বক্তব্যে কোনো ভিন্নতা নেই। এদের মধ্যে সর্বাধিক সুন্দর সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন ইমাম তাহির বিন সালিহ আল-জাযায়িরী রহ. (মৃত্যু- ১৩৩৮ হি.)। তিনি লিখেন-
উসুলে ফিকাহর আলিমগণের ভাষ্য অনুযায়ী হাদীস হলো-
الحديث هو أقوال رسول الله صلي الله عليه وسلم وأفعاله-
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যাবতীয় কথা ও কার‌্যাবলীকে হাদীস বলা হয়।
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষা অনুযায়ী হাদীস হলো-
الحديث هو أقوال رسول الله صلي الله عليه وسلم وأفعاله وأحواله-
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা-কাজ ও সমস্ত অবস্থাকে হাদীস বলা হয়। (তাওজীহুন নযর ফী উসূলিল আসার)
ইমাম সাখাবি রহ. (৯০২ হি.) হাদীসের সংজ্ঞা এভাবে উল্লেখ করেন-
الحديث لغة: ضد القديم- واصطلاحا: ما أضيف إلي النبي صلي الله عليه وسلم قولا له أو فعلا أو تقريرا أو صفة حتي الحركات والسكنات في اليقظة والمنام-
আভিধানিক অর্থে হাদীস হলো পুরান হওয়ার বিপরীত।
অপরদিকে পারিভাষিক অর্থে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা-কাজ, মৌনসমর্থন, গুণাবলী, এমনকি তাঁর নড়াচড়া ও স্থিরতা- হোক সেটা জাগ্রত অবস্থায় কিংবা ঘুমন্ত অবস্থায়- সবকিছুই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। (ফাতহুল মুগীস- সাখাবি)

হাদীসের কিতাবসমূহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ, মৌন সমর্থন, চারিত্রিক ও সৃষ্টিগত গুণাবলী, যে কোন অবস্থা, এমনকি নড়াচড়া ও স্থিরতা; জাগ্রত অবস্থায় হোক কিংবা ঘুমন্ত অবস্থায়; ইচ্ছাকৃত হোক কিংবা অনিচ্ছাকৃত; নবী হওয়ার আগে হোক বা পরে- সব কিছুই হাদীস হিসেবে পরিগণিত হয়। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স¦প্ন, ইলহাম-কাশফ ইত্যাদি সবকিছুই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত।

সুতরাং নিম্নোক্ত চারটি বিষয়ের সমন্বিত রূপকে হাদীস বলা হয়।

এক.

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সারা জীবনে যা কিছু বলেছেন।

দুই.

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সারা জীবনে যা কিছু করেছেন।

তিন.

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সারা জীবনে যেসব বিষয়ে সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।

চার.

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যক্তিগত অবস্থা ও গুণাবলী।
উল্লেখ্য, উপরোক্ত সবকিছু হাদীস হলেও সবগুলোর অনুসরণ আবশ্যক নয়। যথা- নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সৃষ্টিগত গুণাবলী ইত্যাদি। সুন্নাহর পরিচয় জানলে এ বিষয়টি বুঝা আরো সহজ হয়ে যায়। নিম্নে সুন্নাহ-এর পরিচয় দেওয়া হলো।

সুন্নাহ-এর পরিচয়
সুন্নাহ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- পথ বা পদ্ধতি। কুরআন-হাদীস ও ফিকাহর পরিভাষায় সুন্নাহর ভিন্ন ভিন্ন অর্থ থাকলেও হাদীসের পরিভাষায় সুন্নাহ হলো- الطريقة المسلوكة في الدين- তথা মুসলিমগণের জন্য অনুসরণীয় দ্বীনের পথ।
মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুসরণীয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পথকে হাদীসের পরিভাষায় সুন্নাহ বলা হয়। সুতরাং হাদীস ও সুন্নাহ শব্দ দুটি একে অপরের সমার্থক নয়; আবার বিরোধীও নয়; বরং এ শব্দ দুটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিন্ন। এই আলোকে হাদীস ও সুন্নাহর পারস্পরিক সম্পর্ক তিন রকম হয়ে গেলো। যথা-
এক. কখনো কখনো হাদীস পাওয়া যায়, কিন্তু সুন্নাহ থাকে না। এর বর্ণনার প্রকার তিনটি। সেগুলো নিম্নরূপঃ
১. রহিত বিধানঃ ওইসব বর্ণিত কাজ এক সময় শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত ছিলো; কিন্তু পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে গেছে। এ জাতীয় বর্ণনা হাদীসের আওতায় পড়ে, কিন্তু এগুলো সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ সুন্নাহ বলা হয় উম্মাহর জন্য অনুসরণীয় কোনো বিষয়কে। আর এগুলোর বিধান রহিত হয়ে যাওয়ার কারণে সেগুলো আর অনুসরণীয় থাকেনি। যথা- একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
توضؤوا مما مست النار-
অর্থঃ তোমরা আগুনে রান্না করা কোনো কিছু খাওয়ার পরে ওযু করে নাও।
উক্ত হাদীসের বিধান আগে কার্যকর ছিলো; কিন্তু পরবর্তীতে এর হুকুম রহিত হয়ে যাওয়ায় তা আর সুন্নাহ (অনুসরণীয়) হয়ে থাকেনি। তাই এটা হাদীস বটে, কিন্তু সুন্নাহ নয়।

ইসলামের প্রথম যুগে মাসবুক ব্যক্তি সালাত আদায়রত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করতো- কত রাকাত ছুটে গেছে। এরপর প্রথমে সে ছুটে যাওয়া রাকাত পুরা করে জামাতে শরিক হয়ে যেতো। সাহাবী মু’আয রাযি. একবার এর ব্যতিক্রম করলেন। তিনি প্রথমে নবীজির পিছনে জামাতে শরিক হয়ে পরে ছুটে যাওয়া রাকাত পুরা করলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে বললেন- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার পিছনে জামাত ছেড়ে একাকী সালাত আদায় করতে ইচ্ছা করেনি; তাই এমনটি করেছি। এ কথা শোনে নবীজি খুশি হয়ে বললেন-
إن معاذا سن لكم سنة- فاتبعوها-
নিশ্চয়ই মু’আয তোমাদের জন্য একটি সুন্দর পথ রচনা করেছে। তোমরাও এ পথ অনুসরণ করো। নবীজি এখানে মু’আয রাযি.-এর এই আমলকে সুন্নাহ বলেছেন; কারণ এটা অনুসরণীয়। আর তাই সবাইকে এ রকমই করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আগের বিধান রহিত হয়ে যাওয়ার ফলে তা হাদীস হলেও সুন্নাহ থাকেনি।
২. নবীজির সাথে সম্পৃক্ত হাদীসঃ কিছু বর্ণনা হাদীসে এমন রয়েছে, যেগুলো শুধুমাত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য পালনীয়; অন্য কারো জন্য নয়। যথা- বিবাহের ক্ষেত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য চার সংখ্যার কোনো শর্ত ছিলো না।
এ কারণে তিনি একই সময়ে একই সাথে নয়জন স্ত্রী রেখেছেন। অথচ উম্মাহর জন্য একই সাথে চারের অধিক বিবাহ করা হারাম। সুতরাং এটা হাদীস বটে; কিন্তু তা সুন্নাহ নয়। এ সম্পর্কে কুরআনের আয়াত দেখুন- সূরা আহযাব- ৫০।
৩. বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর বিধানঃ বিশেষ কোনো কারণে বা কোনো কিছু বুঝানোর জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছেন কিংবা নিজে করেছেন; তবে উম্মাহকে সাধারণ অবস্থায় তা অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। নিম্নে দুটি উদাহরণ দেওয়া হলো।
এক- মাগরিবের সালাতের আগে নফল আদায় করা সুন্নাত নয়; বরং জায়েয মাত্র। যদি এ কারণে মাগরিবের সালাত আদায়ে বিলম্বিত না হয়। এ হাদীসটির মূল বাক্য নিম্নরূপঃ
عن النبي صلي الله عليه وسلم قال: صلوا قبل صلاة المغرب- قال في الثالثة لمن شاء- راهية أن يتخذها سنة-
এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে মূলত অন্য একটি মাসআলা বুঝানোর জন্য। তা হলো- আসরের সালাতের পরে নফল আদায় করার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আছে- তার সময়সীমা হলো সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত। সূর্যাস্তের পরে কেউ ইচ্ছা করলে নফল আদায় করতে পারে। তবে এ সময় নফল আদায় করা সুন্নাহ (অনুসরণীয়) নয়।
কারণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীনের কেউই মাগরিবের সালাতের আগে নফল আদায় করতেন না।

সুতরাং প্রমাণিত হলো- উক্ত হাদীসটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে বর্ণনা করা হয়েছে। সূর্যাস্তের পরপর নফল আদায় করতেই হবে অথবা আদায় করা যাবে না- এর সাথে এ হাদীসের কোনো সম্পর্কই নেই। তাই নিঃসন্দেহে এটা হাদীস; কিন্তু এটা সুন্নাহ নয়। হ্যাঁ, কোনো কোনো সাহাবী কোনো কোনো সময় পরবর্তীতে মসজিদের খুটির আড়ালে ওই সময় নফল আদায় করতেন। এর দ্বারা এটার বৈধতা প্রমাণিত হয়; তবে সুন্নাহ নয়।
দুই- দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদীসে বলা হয়েছে- নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার একটা দেয়ালের ভগ্নাবশেষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেছেন। এটা অবশ্যই হাদীস, কিন্তু এটা কখনোই সুন্নাহ নয়। কারণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা বসেই প্রস্রাব করেছেন। তাই বসে বসে প্রস্রাব করা সুন্নাহ।
অপরদিকে তিনি জীবনে একবার দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে বুঝাতে চেয়েছেন যে, প্রস্রাব করার স্থানটি আবর্জনাযুক্ত কিংবা শারিরীক কোনো সমস্যার কারণে বসতে অসম্ভব হলে তার জন্য দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার বিধান রয়েছে।

দুই. কখনো কখনো সুন্নাহ পাওয়া যায়, কিন্তু হাদীস পাওয়া যায় না। যথা- ইসলামের মহান চার খলীফা যথাক্রমে সাহাবী আবু বকর রাযি., ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি., উসমান ইবনে আফফান রাযি. এবং আলী ইবনে আবি তালিব রাযি.-এর সুন্নাহ। অর্থাৎ তাঁদের স্ব স্ব খিলাফতের আমলে যাবতীয় সিদ্ধান্ত এবং কার‌্যাবলী। এগুলো হলো সুন্নাহ; অর্থাৎ উম্মাহর জন্য অনুসরণীয়, কিন্তু এগুলো হাদীস নয়।
কারণ হাদীস বলা হয়- যা কিছু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত। অপরদিকে সুন্নাহর অর্থ হলো অনুসরণীয়- যা এর আগে আলোচনা করা হয়েছে। অপরদিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর খলীফাগণের সুন্নাহর ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন-
عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين- تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ-
অর্থঃ তোমাদের ওপর আমার সুন্নাহ এবং আমার সত্য পথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহর অনুসরণ করা অবশ্য কর্তব্য। তোমরা এদের সুন্নাহগুলোকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরো।

উদাহরণঃ

খলীফা আবু বকর রাযি.-এর সুন্নাহঃ
 কেন্দীয় সরকারকে যাকাত প্রদান করতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ;
 জীবদ্দশায় পরবর্তী খলীফা নির্বাচন করা ইত্যাদি।

খলীফা ওমর ইবনে খাত্তাব রাযি.-এর সুন্নাহঃ
 একই মজলিসে বা এক বাক্যে তিন তালাক বললে তা তিন তালাক বলেই বিবেচিত হওয়া;
 রমযানে তারাবীহর সালাত জামাতে বিশ রাকাত আদায় করা।

খলীফা উসমান ইবনে আফফান রাযি.-এর সুন্নাহঃ
 জুমু’আর সালাতের আগে একটি আযান বৃদ্ধিকরণ;
 কুরআনুল কারীমের বর্ণনা কুরাইশি ভাষায় অনুমোদন ইত্যাদি।
খলীফা আলী ইবনে আবি তালিব রাযি.-এর সুন্নাহঃ
পারস্পরিক দুই মুসলিম পক্ষের মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হলে বিজিতদের সম্পদ গণীমতের সম্পদ বলে বিবেচিত না হওয়া এবং বন্দিগণের দাস-দাসী না হওয়ার সিদ্ধান্ত। অথচ কাফিরদের সাথে যুদ্ধ হলে তাদের সম্পদ গণীমতের সম্পদ এবং তাদের বন্দিগণ দাস-দাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
তিন. কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাদীস ও সুন্নাহ একই সাথে বিদ্যমান। যথা- উপরোক্ত দুটি পদ্ধতির আওতাবহির্ভুত সব বর্ণনা এর অন্তর্ভুক্ত।

আব্দুল্লাহ আল মাসূম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.