হাদীস ও সুন্নাহ কীভাবে সুসংরক্ষিত

0
854
sunna
sunna

হাদীস ও সুন্নাহ সংরক্ষণের ইতিহাস যত দীর্ঘই হোক না কেনো, এর মূলকথা এই যে, আল্লাহ তা’আলা নিজে তা সংরক্ষণ করেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত করবেন এবং এটাই স্বাভাবিক। কারণ আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন-
إنا نحن نزلنا الذكر وإنا له لحافظون-
অর্থঃ নিশ্চয় আমি এই উপদেশ (গ্রন্থ) অবতীর্ণ করেছি এবং নিশ্চয় আমিই এর সংরক্ষণকারী। (সূরা হিজর-৯)
এখানে আল্লাহ তা’আলা কুরআনের হিফাযতের ওয়াদা করেছেন। আর শব্দ ও মর্ম উভয়ের সমষ্টির নামই কুরআন। শুধু শব্দ বা ব্যাখ্যার নাম কুরআন নয়। তাই এ কথা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ তা’আলা উক্ত আয়াতে কুরআন ও সুন্নাহ উভয়েরই হিফাযতের ওয়াদা করেছেন। কেননা কুরআন মাজীদের বক্তব্য অনুযায়ী হাদীস বা সুন্নাহ হলো কুরআন মাজীদের ব্যাখ্যা ও ভাষ্য। তাছাড়া (যিকর) শব্দের অর্থ হলো নসীহত।
আল্লাহ তা’আলা উক্ত আয়াতে কুরআন মাজীদ হিফাযতের ওয়াদা করতে গিয়ে কুরআন মাজীদের বিভিন্ন নাম থেকে ‘যিকর’ নামটি উল্লেখ করেছেন। আর অর্থ ও ব্যাখ্যা ছাড়া শুধু শব্দ নসীহত হতে পারে না। সুতরাং ‘যিকর’ শব্দই এ কথার প্রকৃষ্ট প্রমাণ যে, আল্লাহ তা’আলা উক্ত আয়াতে কুরআন মাজীদের শব্দ এবং এর অর্থ ও ব্যাখ্যা, যার অপর নাম হাদীস ও সুন্নাহ- উভয়েরই হিফাযতের ওয়াদা করেছেন।
কেননা যে কিতাব শুধু তিলাওাতের জন্য নয়; বরং চিন্তা-গবেষণা, উপদেশ গ্রহণ এবং আমল ও বিধি-বিধান পালনেরও জন্য, শুধু তার শব্দের হিফাযত যথেষ্ট নয়। কুরআনের হিফাযত যদি শব্দে সীমাবদ্ধ থাকে আর অর্থ-বিকৃতির পথ খোলা থাকে, তাহলে কুরআনের চির সংরক্ষিত হওয়ার সুসংবাদ সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়ে পড়ে। তখন এ বিষয়টি প্রমাণিত হয় যে, কুরআন মাজীদ স্থায়ীভাবে তার অর্থ ও ব্যাখ্যা সংরক্ষণে ব্যর্থ। অথচ এটা অবাস্তব বিষয় !

সুতরাং যেভাবেই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হোক না কেনো, এ কথা নিশ্চিত যে, হাদীস ও সুন্নাহর হিফাযত কুরআন মাজীদ হিফাযতের ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত। তাই কুরআন মাজীদের সাক্ষ্য এবং বাস্তবতার সাক্ষ্য সর্বদিক থেকে এ কথা অকাট্য যে, কুরআন মাজীদের অর্থ-ব্যাখ্যা ও বাস্তবরূপ (যার পারিভাষিক নাম নববী আদর্শ এবং হাদীস ও সুন্নাহ) সবগুলোই নিশ্চিতভাবে সংরক্ষিত।
এছাড়া হাদীস হিফাযতের ইতিহাস ও তার উপায়-উপকরণ এবং হাদীসের সুবিশাল ভাণ্ডারের প্রতি আলোকপাত করলে উক্ত ওয়াদার সত্যতাই প্রমাণিত হয়।
বাস্তব কথা হলো, নবুয়তের ধারাবাহিকতার পরিসমাপ্তির পর আল্লাহ তা’আলা প্রদত্ত শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিদায়াত ও শিক্ষা-দীক্ষা এবং তাঁর উত্তম আদর্শ হিফাযতের এরূপ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য ছিলো। যেহেতু তাঁর পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নতুন নবী আসবেন না এবং এই পৃথিবীবাসীর শেষ জনগোষ্ঠী পর্যন্ত তিনিই নবী, তাই সংগত কারণেই তাঁর হিদায়াত, শিক্ষা-দীক্ষা এবং উত্তম নমুনা পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।

যাতে সকল যুগের সত্যানুসন্ধানীরা তা থেকে হিদায়াতের সেই নূর গ্রহণ করতে পারে, যে নূর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারী সৌভাগ্যবান ব্যক্তিগণ সরাসরি নবুওয়তের পবিত্র দরবার থেকে গ্রহণ করতেন।
আজও যে কোনো বিবেকবান জ্ঞানী ব্যক্তি এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, বিগত চৌদ্দ শতাব্দী যাবত আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে এ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুসংহত রূপে বিদ্যমান ছিলো এবং পৃথিবীর শেষ দিবস পর্যন্ত তা অব্যহত থাকবে।

সংরক্ষিত থাকার মর্ম
এখানে একটি বিষয় জেনে নেওয়া দরকার যে, হিফাযতের উদ্দেশ্য এই নয় যে, হিফাযতকৃত বস্তুর ক্ষেত্রে কারো থেকে কোথাও কোনো প্রকার ত্র“টি প্রকাশ পাবে না; বরং উদ্দেশ্য হলো, তাতে কারো কোনো ত্র“টি স্থায়িত্ব লাভ করতে পারবে না। যখনই কোনো ভুল হবে বা কোনো কথা ছুটে যাবে, সাথে সাথে তা সংশোধনের সকল উপায় উপকরণ বিদ্যমান থাকবে। হাদীস ও সুন্নাহর হিফাযতের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে হলে প্রথমে কুরআন মাজীদ হিফাযতের বিষয়টি বুঝতে হবে।

পাঠকমাত্রই অবগত আছেন যে, আল্লাহ তা’আলা নিজেই কুরআন মাজীদ হিফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং ওয়াদা মুতাবেক তা যথাযতভাবে হিফাযত করেছেন। তাই বলে কি আপনি কোনো হাফিয সাহেবকে তিলাওয়াতে ভুল পরতে শোনেননি? লিপিকারের কি কুরআন মাজীদ লিখতে ভুল হয় না? কোনো মুদ্রণকরের কি কুরআন মাজীদের যের-যবরের এদিক ওদিক হয় না?
এসব প্রশ্নের জবাব একটাই যে, কোনো বিষয়ে কারো ভুল হয়ে যাওয়া এক কথা আর সে ভুল স্থায়িত্ব লাভ করা ভিন্ন কথা। যখনই কেউ ভুল করে, সাথে সাথে তার ভুল চিহ্নিত করে দেওয়া হয় এবং তা সংশোধন করে দেওয়া হয়। কেউ অসৎ উদ্দেশে এরূপ করলে তার প্রতিবাদ করা হয় এবং মুখোশ উন্মোচন করে দেওয়া হয়।

আর এ কথা বলাই বাহুল্য যে, একটি সংরক্ষিত বিষয় উপস্থাপন বা বর্ণনার ক্ষেত্রে কারো ভুল হওয়ার বিষয়টির ওপর কোনোই প্রভাব পড়ে না। কারণ তা স্বস্থানে সুনিশ্চিতভাবে সংরক্ষিত। আর ভুল তো হয়েছে ব্যক্তি বিশেষ থেকে, যা তার পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। ভুল ভুলকারী পর্যন্ত, বিকৃতি বিকৃতি সাধনকারী পর্যন্ত সীমিত রয়েছে। অপরদিকে আসল জিনিস সম্পূর্ণ সহীহ শুদ্ধভাবে সংরক্ষিত ছিলো এখনো আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে; কারণ আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং কুরআনুল কারীমের চির সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.