হাদীস সংকলনের সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিক ইতিহাস- ৫ম পর্ব

0
1346
hadiths
hadiths

দ্বিতীয় পর্যায়ঃ তাবেয়ীগণের যুগে হাদীস সংকলন
হিজরী প্রথম শতাব্দীতে অর্থাৎ নবীজির সাহাবীগণের স্বর্ণালী যুগে হাদীস ব্যক্তিগতভাবে এভাবেই সংরক্ষিত ছিলো। তবে হিজরী প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে হাদীসের সংকলন ও সংরক্ষণের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। এর প্রেক্ষাপট ছিলো নিম্নরূপঃ

এ সময়ে ইসলামের আলো আরবের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিলো। দিন দিন ইসলামের সীমানা বিস্তৃতি লাভ করছিলো। এর ফলে দলে দলে নানা দেশ ও বর্ণের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলো। কিন্তু তাদের স্মৃতিশক্তি আরবের লোকদের মতো প্রখর ছিলো না।
তাছাড়া নবীজির শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণ পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে শুরু করছিলেন। অথচ তাঁরাই ছিলেন নবীজির হাদীসের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আবার এদিকে কিছু কিছু জায়গায় বিভিন্ন রকমের ভ্রান্ত দল-মতের উদ্ভব ঘটছিলো, যারা নিজেদের দাবি কিংবা মতের পক্ষে জাল হাদীস রচনা শুরু করেছিলো। এ সব কারণে ব্যাপকভাবে হাদীস লিখে সংরক্ষণ করার প্রয়োজন দেখা দিলো।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হাদীসগ্রন্থ রচনা
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সর্বপ্রথম হাদিস সংকলনের উদ্যোগ নেওয়া হয় তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের খলিফা ওমর বিন আব্দুল আজিজ রহ.-এর নির্দেশে। এর আগে সরকারিভাবে হাদিস সংকলনের কাজ অন্য কেউই করেনি। তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইমাম ইবনে শিহাব যুহরি রহ. সরকারীভাবে হাদীস সংকলনের কাজ শুরু করেন।

সরকারি উদ্যোগে হাদীস সংকলন ও সুন্নাহর সংরক্ষণে তাঁর ভূমিকা
খেলাফতের কর্মময় ব্যস্ততার পাশাপাশি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সরকারি ব্যবস্থাপনায় নবীজির হাদিস সংকলন ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যা তাঁর আগে অন্য কোনো খলিফা করেননি। অন্যান্য হাদিস সংরক্ষণকারীদের থেকে এ ক্ষেত্রেই তিনি সবার থেকে আলাদা ছিলেন। যার ফলে খেলাফতের সংস্কার কাজে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালনের পাশাপাশি হাদিস সংকলন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও তিনি ইতিহাসের পাতায় বিপ্লবী স্থান দখল করে নেন।

কারণ হিজরী প্রথম শতাব্দীতে অর্থাৎ নবীজি ও নবীজির সাহাবীগণের স্বর্ণালী যুগে হাদীস ব্যক্তিগতভাবে অনেকের কাছে সংরক্ষিত ছিলো। যথা- নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস লিখার অনুমতি দেওয়ার পর তখন থেকেই কোনো কোনো সাহাবী নবীজির জীবদ্দশাতেই হাদীস লিখে সংরক্ষণ করতে শুরু করেন। আর এটা ছিলো হাদীস সংরক্ষণের প্রথম পর্যায়। সাধারণত সাহাবীগণ তিন পদ্ধতিতে হাদীস সংরক্ষণ করতেন।
এক. মুখস্থ করে হাদীস সংরক্ষণ; আল্লাহ তা’আলা তৎকালীন আরবের অধিবাসীদেরকে অভাবনীয় বিষ্ময়কর স্মরণশক্তি দান করেছিলেন। তাই তাদের জন্য মুখস্থ করে রাখাটাই সর্বাধিক সহজ ও নির্ভরযোগ্য পন্থা ছিলো।
দুই. হাদীস শোনার পরে সে অনুযায়ী আমল করা।
তিন. হাদীস লিখে সংরক্ষণ করা। এ পর্যায়ে কোনো কোনো সাহাবী ব্যক্তিগতভাবে হাদীস লিখে রাখতেন। তাঁদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন- আব্দুল্লাহ বিন আমর রাযি.। তাঁর লিখিত হাদীসের সংগ্রহ “সহীফায়ে সাদিকাহ” নামে প্রসিদ্ধ।
এছাড়া সাহাবী আলী বিন আবি তালিব রাযি., আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. এবং আনাস বিন মালিক রাযি.ও ব্যক্তিগতভাবে হাদীসের সংকলন তৈরি করেছিলেন।

আবু বকর ইবনে হাযম এবং ইবনে শিহাব যুহরির প্রতি খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নির্দেশ
এ জন্য খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ প্রখ্যাত মণীষী আবু বকর ইবনে হাযম এবং তৎকালীন অভিজ্ঞ মুহাদ্দিস ইবনে শিহাব যুহরির প্রতি ইসলামি সাম্রাজ্যের প্রতিটি শহর ও গোত্রীয় নিবাস থেকে অনুসন্ধান করে করে হাদিস লিখে নেওয়ার জন্য অথবা হাদিসের পান্ডুলিপি সংগ্রহ করে এক জায়গায় একত্রিত করার লক্ষ্যে নির্দেশনামা জারি করেন।

তিনি এই মর্মে ইবনে হাযামকে চিঠিতে লিখেন, ‘নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো হাদিস পাওয়ামাত্রই আপনি তা লিপিবদ্ধ করুন। কারণ আমি ইলমের অবসান ও আলিমগণের বিদায়ের আশংকা করছি’।
তাঁর উপরোক্ত এ কথাটি পরবর্তীতে হাদিস সংরক্ষণে মুহাদ্দিসগণকে ব্যকুল করে তোলে। এছাড়া তিনি হাদিস সংগ্রহের ব্যাপারে আমরাহ বিনতে আনসারিয়্যাহ এবং কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবি বকরের বিশেষ সহযোগিতা কামনা করে তাদেরকেও হাদিস লিপিবদ্ধ করতে অনুরোধ করেন।

হাদিস যাচাই ও সংরক্ষণে কমিটি গঠন
খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খেলাফতের বিভিন্ন শহর থেকে হাদিসের পান্ডুলিপি সংগ্রহ করার পর হাদিস লেখায় যাবতীয় ভূল সংশোধন করে দেওয়ার লক্ষ্যে এবং হাদিসের মান যাচাই করার জন্য বিজ্ঞ আলিম ও মুহাদ্দিসগণের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন।
এ ব্যাপারে আবু যিনাদ আব্দুল্লাহ ইবনে যাকওয়ান কুরাশি বলেন, আমি খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে দেখেছি, তিনি হাদিস সংরক্ষণের যাবতীয় কার্যাবলী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আলাদা কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। তাঁদের কাজ ছিলো কোন হাদিসের ওপর কখন কীভাবে আমল করা হবে এবং একাধিক বর্ণনায় একই মর্ম সম্বলিত হাদিসের মাঝে সমন্বয় সাধন করে সে অনুযায়ী ফয়সালা প্রদান করা। তাছাড়া তাঁরা ভুল সংশোধনের কাজও করতেন।

সরকারি উদ্যোগে হাদিস সংকলন ও সংরক্ষণ
এ তো ছিলো হাদিস সংকলন ও সংরক্ষণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যা আগে থেকেই চলে আসছে। কিন্তু খেলাফতের সংস্কারে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালনের পাশাপাশি হাদিস সংকলন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যে কারণে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খোলাফায়ে রাশেদীনের পরবর্তী অন্যান্য খলিফাদের চেয়ে ব্যতিক্রম চরিত্রে ইতিহাসের পাতায় আমর হয়ে আছেন, তা হলো সরকারি উদ্যোগে তিনিই প্রথম হাদিস সংকলন শুরু করেন।
এ মহান কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি সাম্রাজ্যের সমস্ত গভর্নর ও দেশের আলিমগণের নিকট সংরক্ষিত হাদীস সমূহ চেয়ে ফরমান জারি করেন। বিশেষ করে তাঁর নির্দেশে ইমাম ইবনে শিহাব যুহরি রহ. সরকারিভাবে হাদীস সংকলনের কাজ শুরু করেন। এরপর তাঁর সাথে আরো অনেক আলিম এ কাজে যুক্ত হন। ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ হাদিস সংকলনের কাজে নিয়োজিত আলিমদের জন্য সরকারি ভাতাও নির্ধারণ করে দেন।

খলিফার এ মহৎ উদ্যোগ মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র অভুতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং কিছু দিনের মধ্যেই হাদীসের বড় বড় সংকলন প্রস্তুত করা হয়। যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
 মাকহুল রহ.-এর ‘কিতাবুস সুনান’;
 যুহরি রহ.-এর ‘দাফাতিরুয যুহরি’।
 এরপর দ্বিতীয় শতাব্দীতে সর্বপ্রথম ইমাম আবু হানিফা রহ. ফিকহি অধ্যায়ের বিন্যাসে শুধুমাত্র সহীহ হাদীসের সংকলন ‘কিতাবুল আছার’ রচনা করেন।
 ইমাম মালিক রহ. ‘মুয়াত্তা’ নামে হাদীসের সংকলন তৈরি করেন।
 ইবনে মুবারক রহ. কর্তৃক রচিত ‘কিতাবুয যুহদ’;
 সুফিয়ান সাওরি রহ. কর্তৃক রচিত ‘জামে’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। (তাবাকাতে ইবনে সাদঃ ৫/৪৯৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.